অধ্যাপক (ডা:) মবিন খান
লিভার রোগ ও মেডিসিন বিশেষজ্ঞ

মির্জা গোলাম হাফিজ রোড,
বাড়ি নং- ৬৪, রোড নং-৮/এ,
ধানমণ্ডি আ/এ, ঢাকা- ১২০৯
বাংলাদেশ |

শহরের স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মুরাদ হোসেন, বয়স পঞ্চাশ, উদ্বিগ্ন মনে একজন বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের চেম্বারে বসে আছেন। কয়েকদিন যাবৎ তার পেটটা ভাল যাচ্ছে না। এর আগেও তার পাতলা পায়খানার সমস্যা হয়েছে। কিন্তু এবার তিনি লক্ষ্য করেছেন- পায়খানার সাথে লাল লাল রক্ত যাচ্ছে। তাই তিনি চিন্তিত মনে তার সমস্যা নির্ণয়ের চেষ্টায় চিকিৎসকের শরণাপন্ন হয়েছেন।

পারভিন আক্তার  ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী। বয়স চব্বিসের কাছাকাছি হবে।  কয়েক মাস ধরে তার পেটে সমস্যা হচ্ছে। দিনে দু থেকে তিনবার পায়খানা হয়, প্রত্যেকবার পায়খানার আগে পেটটা মোচড় দিয়ে ব্যথা হয়, পায়খানা হয়ে গেলে ব্যথা কমে যায়। পেটে শব্দ হয় এবং পায়খানা কিছুদিন পাতলা হয়, আবার কিছুদিন ভাল থাকে। পায়খানার সাথে আম যায়।  এমতাবস্থায় দৈনন্দিন কাজে সমস্যা হওয়ায় একজন বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের নিকট পরামর্শের জন্য এসেছেন।

দীর্ঘমেয়াদী লিভার প্রদাহের সমস্যায় ভুগছেন চল্লিশ বছর বয়সী রাকিব মোল্লা।  নিয়মিত চিকিৎসকের পরামর্শে ঔষধ সেবন করে যাচ্ছেন। কয়েক মাস হল তার পায়খানা পাতলা হতে শুরু করেছে। কিছুদিন ভাল থাকে, কিছুদিন পাতলা হয়, কিছুদিন কষা হয়। পায়খানার সাথে আম যায়। পেটে খুবই সমস্যা মনে হতে থাকে। তাই উদ্বিগ্ন মন নিয়ে ডাক্তারের প্রেসক্রিপশনের অপেক্ষায় আছেন।

আব্দুল করিম শিল্পপতি মানুষ। বয়স ষাট ছুঁই ছুঁই করছে। তিন মাসের বেশী সময় ধরে তার পায়খানার সাথে রক্ত যাচ্ছে। প্রথমবার যখন পায়খানা লালচে হতে শুরু করলো ডাক্তারের কাছ থেকে চিকিৎসা নিয়ে ভালো হয়ে গিয়েছিল। গত কয়েকদিন যাবৎ তার পায়খানার সাথে আবারও রক্ত যেতে শুরু করেছে, সাথে আম যাচ্ছে। এবার তার গায়ে জ্বর , খাওয়ার রুচিও কমে গেছে।  তিনি লক্ষ্য করেছেন গত কয়েকমাস ধরে তার ওজনও কমে যাচ্ছে। তদুপরি এর আগে তার ফ্যাটি লিভারের সমস্যা ধরা পড়েছে। তাই বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের শরণাপন্ন হয়েছেন রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসার উদ্দেশ্যে।

উপরের যে চিত্রগুলো দেয়া হয়েছে তা আমাদের দৈনন্দিন জীবনের ছবি হয়তো। পেটের অসুখ তথা পাতলা পায়খানা হয়নি এরকম একজন ব্যক্তি পুরো পৃথিবীতে খুঁজলেও পাওয়া যাবে না।  পুরো পৃথিবীতে বছরে প্রায় ৩৫ লাখ মানুষ পাতলা পায়খানার সমস্যা নিয়ে চিকিৎসা গ্রহণ করেন।  পায়খানার ধরনের উপর ভিত্তি করে পাতলা পায়খানার সমস্যা কয়েক রকম হতে পারে। পানির মত পাতলা, আমযুক্ত পাতলা এবং রক্তসহ পাতলা। আমযুক্ত যে পাতলা পায়খানার সমস্যা হয় তাকে আমাশয় বলে।
বাংলাদেশ সহ পুরো পৃথিবীর মানুষের একটি সাধারণ সমস্যা  হলো আমাশয়। আক্রান্ত রোগীরা ডাক্তারের কাছে যে সকল সমস্যা নিয়ে হাজির হয়, তার মধ্যে আছে আমযুক্ত পায়খানা, কারও আবার পায়খানার সাথে রক্ত আসে। অধিকাংশই পেটে ব্যথা বা খারাপ লাগার কথা বলে। কেউ কেউ সাথে বমি বমি ভাব, বমি, খাওয়ার রুচি কমে যাওয়া, ওজন কমে যাওয়া ইত্যাদি সমস্যার কথা বলেন।  কারও সমস্যা এক সপ্তাহের বেশী স্থায়ী হয় না আবার কারও সমস্যা মাস পেরিয়ে যায়। কারও কয়েক বছরে হঠাৎ দুএকবার এ সমস্যা হয়, কারও মাসে একবার পেট খারাপ হয়। পেট খারাপ থাকার সময়কালের উপর ভিত্তি করে আমাশয়কে দুভাগে ভাগ করা যেতে পারে।
১. স্বল্পমেয়াদী
২. দীর্ঘমেয়াদী
স্বল্পমেয়াদী আমাশয় বলতে বুঝায়, এক সপ্তাহের কম সময় ধরে আমাশয় থাকা। স্বল্পমেয়াদী আমাশয়ের কারণগুলোর মধ্যে অন্যতম প্রধান দুটি হলো: ব্যাকটেরিয়া জনিত আমাশয় এবং অ্যামিবা জনিত আমাশয়। এছাড়াও কিছু কিছু দীর্ঘমেয়াদী আমাশয়ের কারণ আছে যেগুলো মাঝে মাঝে স্বল্পমেয়াদী সমস্যা নিয়ে উপস্থিত হয়।
দীর্ঘমেয়াদী আমাশয় হল-  যে আমাশয় চার সপ্তাহের বেশী সময় ধরে হচ্ছে। এ ধরনের আমাশয়ের অন্যতম প্রধান কারণগুলো হলো: ইরিটেবল বাওয়েল সিনড্রোম (আই বি এস) এবং ইনফ্লেমেটরী বাওয়েল ডিজিজ (আই বি ডি)। আইবিডি-র মধ্যে আবার আছে ক্রনস ডিজিজ এবং আলসারেটিভ কোলাইটিস।
স্বল্পমেয়াদী আমাশয় অল্প সময়ের চিকিৎসা নিয়ে পুরোপুরি ভালো হয়ে যায়। দীর্ঘমেয়াদী আমাশয় হলে দীর্ঘদিন চিকিৎসা নিতে হয় এবং নিয়ন্ত্রণে রাখতে হয়, পুরোপুরি ভালো হয় না।

ব্যাকটেরিয়া জনিত আমাশয়
সাধারণত যে ব্যাকটেরিয়া দ্বারা আমাশয় বেশী হয় তার নাম ঝযরমবষষধ (সিগেলা)। সিগেলার চারটি প্রজাতির মধ্যে ঝযরমবষষধ ভষবীহবৎর দিয়ে গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চলে আমাশয় বেশী হয়। এটি আধোয়া হাত দিয়ে সবচেয়ে বেশী ছড়ায়, তবে দূষিত মাছি ও খাবারের মাধ্যমেও ছড়াতে পারে।

আক্রান্ত ব্যক্তির পেট খারাপ হওয়ার পাশাপাশি পেটে ব্যথা হয়, পায়খানার রাস্তায় ব্যথা হতে পারে। এছাড়াও রোগীর জ্বর হয়, পানিশূন্যতা  ও দুর্বলতা  দেখা দেয়। প্রথমে পায়খানার সাথে রক্ত ও আম যায়, পরে শুধু রক্ত ও আম যেতে থাকে। অনেক সময় সিগেলার আমাশয়ের পাশাপাশি চোখের আইরিস ও গিরায় প্রদাহ হয়ে ‘রিটারস সিনড্রোম’ নামক রোগ হতে পারে।
যে কোন আমাশয় ও ডায়রিয়া জনিত রোগের প্রথম চিকিৎসা হলো স্যালাইন সেবন করা। প্রতিবার পায়খানার পর এক গ্লাস মুখে খাওয়ার স্যালাইন খাওয়া উচিৎ (ওরাল স্যালাইন)। তবে অনেক সময় শরীরের পানি বেশী বেরিয়ে গেলে হাসপাতালে ভর্তি করে শিরায় স্যালাইন দেয়া লাগতে পারে। সিগেলা প্রজাতির আমাশয়তে ডাক্তারের পরামর্শমত এন্টিবায়োটিক ব্যবহারে রোগ পুরোপুরি সেরে যায়।  তবে আমাদের জন্য উদ্বেগের বিষয় হল, অনেক রোগী নিয়মমত এন্টিবায়োটিক ব্যবহার না করায় সিগেলা ব্যাকটেরিয়া বিভিন্ন এন্টিবায়োটিকের বিপরীতে রেজিস্টেন্স তৈরী করে ফেলছে। এভাবে চলতে থাকলে সিগেলা আমাশয় আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসা করা দুরূহ হয়ে পড়বে। তাই রোগীদের উচিৎ এন্টিবায়োটিকসহ অন্যান্য ঔষধ ঠিকভাবে সেবন করা।

সিগেলা ব্যাকটেরিয়া ছাড়াও আরো যে ব্যাকটেরিয়া দ্বারা আমাশয় হয় সেগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল: ঈধসঢ়ুষড়নধপঃবৎ লবলঁহর, ঊংপযবৎরপযরধ পড়ষর(বহঃবৎড়-রহাধংরাব) এবং ঝধষসড়হবষষধ. প্রতিটি ক্ষেত্রেই রোগের লক্ষণগুলো সিগেলা আমাশয়ের মত এবং চিকিৎসাও কাছাকাছি।

অ্যামিবাজনিত আমাশয়
অ্যামিবাজনিত আমাশয় হয় ঊহঃধসড়বনধ যরংঃড়ষুঃরপধ নামক এককোষী জীব দিয়ে। এটির জীবনচক্রে দুটো দশা আছে: ট্রফোজয়েট এবং সিস্ট। ট্রফোজয়েট মূল রোগের কার্যকারণগুলো ঘটায়, তবে এটি ছড়ায় সিস্ট দিয়ে। মানুষের মল দ্বারা দূষিত পানি এবং কাঁচা (অর্থাৎ রান্না করা হয়নি এমন) অপরিষ্কার শাকসবজি ও অন্যান্য খাবার দিয়ে এটি মানুষের অন্ত্রে প্রবেশ করে। এছাড়াও শারীরিক মিলনের মাধ্যমেও এক দেহ থেকে আরেক দেহে ছড়াতে পারে।

অ্যান্টামিবা আমাদের  বৃহদান্ত্রে প্রবেশের পর সিস্ট ভেঙ্গে ট্রফোজয়েটে পরিণত হয়। আমাদের অন্ত্রনালী পেয়াজের লেয়ারের মত চারটি লেয়ার দিয়ে গঠিত নালী। এর মধ্যে সবচেয়ে ভেতরের দিকে সারিবদ্ধ কোষগুলো যে লেয়ার বা স্তর গঠন করে তার নাম মিউকসা। অ্যান্টামিবার ট্রফোজয়েট এই মিউকসাকে আক্রান্ত করে। ফলে পাতলা পায়খানা হয়। পায়খানার সাথে রক্ত ও মিউকাস তথা আমও যেতে পারে। এ রোগেও পেটে ব্যথা হয়। বিশেষ করে তলপেটে ডানদিকে ব্যথা হতে পারে। ফলে এপেনডিসাইটিসের ব্যথা মনে হতে পারে।
অ্যান্টামিবার একটি খারাপ প্রকৃতি হল এটি সিস্ট থেকে মুক্ত হয়ে ট্রফোজয়েট আকারে মানুষের অন্ত্র থেকে ‘পোর্টাল ভেইন’ নামক শিরার মাধ্যমে লিভারে প্রবেশ করতে পারে। লিভারে প্রবেশ করে এটি লিভারের কোষগুলোকে খেয়ে ফেলতে থাকে। এমতবস্থায় এর বিরুদ্ধে আমাদের শরীরের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার কোষগুলোর যুদ্ধ করতে নামলে, লিভারে পুঁজ তৈরী হয়। একে বলে লিভার অ্যাবসেস। লিভারের অ্যাবসেস হলে লিভারে প্রদাহ হয়ে লিভার বড় হয়ে যায়, উপরের পেটে ডানদিকে ব্যথা হতে পারে এবং সাথে কাঁপুনি দিয়ে জ্বর হয়। লিভারের ঠিক উপরেই যেহেতু আমাদের ফুসফুস থাকে, লিভার এবসেস বার্স্ট হয়ে ফুসফুসে ঢুকে যেতে পারে।  সেক্ষেত্রে কাশি হয় এবং বক্ষপিঞ্জের ডানদিকের নিচে ব্যথা হতে পারে। এছাড়া ফুসফুস যে থলি দিয়ে ঘেরা থাকে অর্থাৎ প্লুরাল ক্যাভিটিতেও এই পূঁজ জমা হতে পারে। লিভারের এবসেস বার্স্ট হয়ে যাওয়ার সমস্যা একটি ইমার্জেন্সি সমস্যা এবং হাসপাতালে দ্রুত নেয়ার দরকার পড়ে।

অ্যামিবাজনিত আমাশয় মেট্রোনিডাজল দিয়ে পাঁচ থেকে দশ দিনের চিকিৎসায় ভালো হয়ে যায়। কিন্তু অ্যামিবাজনিত আমাশয় থেকে লিভার অ্যাবসেস হয়ে গেলে সু্ইঁ দিয়ে পূঁজ বের করা সহ, দু থেকে তিন প্রকারের ঔষধ সেবন করে ভালো করতে হয়। এতে তিন থেকে চার সপ্তাহ সময় লেগে যেতে পারে।

ইরিটেবল বাওয়েল সিনড্রোম তথা আইবিএস
দীর্ঘমেয়াদী আমাশয়ের সমস্যার মধ্যে একটি হলো ইরিটেবল বাওয়েল সিনড্রোম তথা আইবিএস। পৃথিবীর মানুষ পরিপাকতন্ত্রের যে সমস্যাটির জন্য সবচেয়ে বেশী কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকে এবং যে সমস্যাটির জন্য জীবনযাপনের মানে ঘাটতি হয় তা হলো আইবিএস। রিসার্চ অনুযায়ী একটি দেশের লোকসংখ্যার ২০ শতাংশ আইবিএসের লক্ষণ বহন করে এবং ১০ শতাংশ ডাক্তারের কাছে চিকিৎসার জন্যে আসে। পুরুষদের চেয়ে মহিলাদের প্রায় দুই থেকে তিনগুণ এই সমস্যায় আক্রান্ত হয়। যারা আইবিএস নামক দীর্ঘমেয়াদী আমাশয় সমস্যায় ভুগে তাদের একটি অংশের উক্ত রোগের  সাথে থাকে বদহজম, দীর্ঘমেয়াদী ক্লান্তি, মাসিকের সময় ব্যথা এবং পুরো শরীর ব্যথা জাতীয় সমস্যা।

আইবিএসের কারণ ও প্রভাবক হিসেবে বিজ্ঞানীরা অনেকগুলো বিষয়কে চিহ্নিত করেছেন। এগুলো দুটো ভাগে ভাগ করা যায়: মনোসামাজিক ও শারীরবৃত্তীয়। মনোসামাজিক কারণের মধ্যে আছে দুশ্চিন্তা ও হতাশা। এছাড়া হঠাৎ অধিক মানসিক চাপও আইবিএসকে প্রভাবিত করে। দেখা গেছে, আইবিএসে আক্রান্ত রোগীরা অল্প সমস্যা  হলেই মানসিকভাবে অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়ে, তারা পরিস্থিতি সহজে মানিয়ে নিতে পারে না। শারীরবৃত্তীয় সমস্যার মধ্যে রয়েছে অন্ত্রনালীর অস্বাভাবিক নাড়াচাড়া, অন্ত্রনালীর বেশী স্পর্শকাতর হয়ে পড়া, এলার্জী ও ইনফেকশন। আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে কেউ কেউ দুধ ও গমজাতীয় খাবার সহ্য ক্ষমতা কম অর্থাৎ এ ধরনের খাবার খাওয়া মাত্রই তাদের আমাশয়ের সমস্যা শুরু হয়ে যায়।

আইবিএস-এর রোগীদের দু ধরনের সমস্যাই হতে পারে: পাতলা পায়খানা ও কোষ্ঠকাঠিন্য। কারও আবার দুটোর মিশ্রণ হয়। অধিকাংশ রোগীরই দেখা যায়, কিছুদিন কোষ্ঠকাঠিন্য যাচ্ছে আবার কিছুদিন পাতলা পায়খানা তথা আমাশয় হচ্ছে। তবে কোনটা বেশী হয় তার উপর ভিত্তি করে আইবিএসকে দুটো ভাগে ভাগ করা হয়- কোষ্ঠকাঠিন্য প্রধান এবং আমাশয় প্রধান।  তবে যে সমস্যাটি প্রায় সবার থাকে তা হলো পুনঃপুনঃ পেটে ব্যাথা। সাধারণত তলপেটে কামড় দিয়ে ব্যথা হয় এবং পায়খানা হয়ে ব্যথা ভালো হয়ে যায়। পেটে বুট বুট আওয়াজ হতে থাকে। যাদের কোষ্ঠকাঠিন্য প্রধান, তাদের পেটে ব্যথার সাথে ছোট ছোট খণ্ডে পায়খানা হয়। আর যাদের আমাশয় প্রধান তাদের ঘন ঘন কিন্তু অল্প পায়খানা হয়। স্বস্থির ব্যাপার হলো, ঘন ঘন পায়খানা হলেও ওজন ঠিক থাকে এবং মলের সাথে শুধু আম যায়, রক্ত যায় না।

আইবিএসের লক্ষণগুলোকে এভাবে সাজানো যায়: ১. মলত্যাগের অভ্যাস পরিবর্তন, ২. পেটে কামড় দিয়ে ব্যাথা, ৩. পেট ফুলে যাওয়া, ৪. মলের সাথে আম যাওয়া এবং ৫. মলত্যাগ করার পর ঠিক ভাবে ত্যাগ হয়নি মনে হওয়া। এই সমস্যাগুলো ৬ মাসের বেশী থাকলে এবং মানসিক চাপের সময় এ ধরনের সমস্যা বেশী হলে ডাক্তাররা আইবিএস হয়েছে বলে সন্দেহ করেন। এছাড়াও যাদের এই সমস্যা আছে তারা পোলাও, কোর্মা, বিরিয়ানী, তেহারী ইত্যাদি তেলযুক্ত খাবার এবং দই, দুধ-চা, পায়েস, সেমাই ইত্যাদি দুধ নির্মিত খাবার খেলে সাথে সাথেই দেখা যায় তাদের পেট খারাপ হয়ে পড়ে। আমাদের লিভার সেন্টারের গবেষণা থেকে দেখা গেছে- যে সকল রোগীদের দীর্ঘমেয়াদী লিভার প্রদাহ থাকে এবং ফ্যাটি লিভার থাকে তাদের অধিকাংশই কোন না কোন সময় আইবিএস-এ আক্রান্ত হয়। আবার যে সকল রোগী পায়খানার অভ্যাসের পরিবর্তন, পেট ফোলা, পেট ব্যথা বা অস্বস্তি, পেটে শব্দ, সুনির্দিষ্ট কিছু খাদ্য হজম না হওয়া জাতীয় সমস্যা নিয়ে আসে তাদের প্রথম প্রথম আইবিএস হিসেবে সন্দেহ এবং চিকিৎসা করা হলেও পরবর্তীতে এদের লিভার সিরোসিস ধরা পড়ে।

আইবিএস-এর চিকিৎসার প্রধান অংশ হল এ বিষয়ে আশ্বস্ত হওয়া যে, এটা ক্যান্সার জাতীয় কোন সমস্যা নয়। রোগীদের একটি দল ভয় পেতে থাকে যে, তাদের ক্যান্সার হল কি না।  এই উদ্বেগ থেকে তাদের পেট খারাপের সমস্যা আরও বেড়ে যায়। এ কারণে রোগের মাত্রা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া জরুরী। এছাড়া যাদের আমাশয় প্রধান আইবিএস তাদেরকে লোপেরামাইড, অ্যামিট্রিপটাইলিন  ইত্যাদি ঔষধ দিয়ে চিকিৎসা করা হয়। যাদের পেটে ব্যথা ও বুট বুট আওয়াজের সমস্যা হয় তাদেরকে মেবেভেরিন, অ্যালভেরিন ইত্যাদি ঔষধ দিয়ে চিকিৎসা করা হয়। যাদের কোষ্ঠকাঠিন্য প্রধান আইবিএস তাদের ফাইবারযুক্ত খাবার (যেমন: শাকসবজি), ইসুপগুলের ভুসি, ল্যাকটুলোজ ইত্যাদি দিয়ে চিকিৎসা করা হয়।

যে সকল রোগী উপরোক্ত উপায়ে ভালো হয় না তারা অন্যান্য উপায়ে চিকিৎসা নিতে পারেন। এগুলোকে মেডিকেলের ভাষায় বলা হয় অল্টারনেটিভ মেডিসিন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো: রিলাক্সেশন থেরাপী, হিপনোথেরাপী, বায়োফিডব্যাক ইত্যাদি। উপযুক্ত চিকিৎসা নিয়ে আইবিএসকে নিয়ন্ত্রনে রাখা গেলে জীবনাচারের মানে অনেক উত্তরণ ঘটে।
আবার যেহেতু লিভার সিরোসিস তথা দীর্ঘ মেয়াদী লিভার প্রদাহের রোগীরা আইবিএস-এর ন্যায় সমস্যায় আক্রান্ত হতে পারে সেহেতু আইবিএস রোগীদের লিভারের কোন সমস্যা আছে কি না তা নিশ্চিত হওয়ার জন্য লিভার বিশেষজ্ঞের পরামর্শ গ্রহণ করা দরকার। অতএব যারা উপরোক্ত সমস্যাগুলো নিজেদের মধ্যে আছে বলে মনে করছেন তাদের উচিৎ অভিজ্ঞ ডাক্তারের শরণাপন্ন হয়ে চিকিৎসা গ্রহন করা।

ইনফ্লেমেটরী বাওয়েল ডিজিজ তথা আইবিডি
দীর্ঘমেয়াদী আমাশয়ের সমস্যার মধ্যে অন্যতম প্রধান হল, ইনফ্লেমেটরী বাওয়েল ডিজিজ তথা আইবিডি। আইবিডির মধ্যে দুটো রোগকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে: ক্রনস ডিজিজ ও আলসারেটিভ কোলাইটিস। রোগ দুটোতে খাদ্যনালীর আক্রান্ত স্থান, আক্রান্তের ধরন ও প্রকৃতি, খাদ্যনালীর বাইরে সমস্যার উপস্থিতি ও চিকিৎসার ধরনের পার্থক্য আছে। আইবিডি একটি দীর্ঘমেয়াদী সমস্যা যা বছরের পর বছর চলতে থাকে এবং হঠাৎ হঠাৎ বেড়ে যাওয়া ও কমে যাওয়ার আচরণ দেখায়। আমাদের মত উন্নয়নশীল দেশে ক্রনস ডিজিজ-এর চেয়ে আলসারেটিভ কোলাইটিস বেশী হচ্ছে। ঔষধ খেয়ে রোগ নিয়ন্ত্রণে রাখলে আইবিডির রোগীদের আয়ু সাধারণ মানুষের গড় আয়ুর সমানই হয়।

আইবিডি রোগের পিছনে জেনেটিক ও পরিবেশগত দুধরনের সমস্যাকে বিজ্ঞানীরা চিহ্নিত করেছেন। আইবিডি রোগের সাথে এইচএলএ লোকাস নামক জিনোমের একটি অংশের সম্পর্ক পাওয়া গেছে। যারা ধূমপান করেন তাদের ক্রনস ডিজিজ বেশী হয় এবং আলসারেটিভ কোলাইটিস অধূমপায়ীদের মধ্যে বেশী হয় (তার মানে এই না যে ধূমপান স্বাস্থের জন্য ভালো। ধূমপান ফুসফুসের মারাত্মক ক্ষতি সাধন করে।) প্রক্রিয়াজাত চিনির সাথে রোগদুটোর হওয়ার সম্পর্ক পাওয়া গেছে।

আইবিডিতে অন্ত্রের বিভিন্ন অংশ আক্রান্ত হয়। আলসারেটিভ কোলাইটিসে বৃহদান্ত্র আক্রান্ত হয়, ক্ষুদ্রান্ত আক্রান্ত হয় না। ক্রনস ডিজিজে ক্ষুদ্রান্ত ও বৃহদান্ত্র দুটোই আক্রান্ত হয়। আলসারেটিভ কোলাইটিসে রেকটাম তথা পায়ুনালী আক্রান্ত হয়, কিন্তু ক্রনস ডিজিজে পায়ুনালী আক্রান্ত হয় না। এই বৈশিষ্ট্যটি ডাক্তারদের রোগ নির্ণয় করতে সাহায্য করে। আলসারেটিভ কোলাইটিসে শুধু মিউকসা স্তর আক্রান্ত হয়, ক্রনস ডিজিজে অন্ত্রের সবগুলো স্তরই আক্রান্ত হয়।

রোগের মাত্রার উপর নির্ভর করে বিভিন্ন লক্ষণ দেখা দিতে পারে। আলসারেটিভ কোলাইটিসে আইবিএসের মত পেটের অভ্যাস দেখা দেয়। অর্থাৎ পায়খানা আমাশয়ের মত হতে পারে আবার কোষ্ঠকাঠিন্যের মত হতে পারে। তবে এর প্রধান লক্ষণ হলো পায়খানার সাথে রক্ত যাওয়া। লক্ষনীয়, স্বল্পমেয়াদী ব্যাকটেরিয়া জনিত আমাশয়েও রক্ত যায়, কিন্তু এর সাথে আলসারেটিভ কোলাইটিসের পার্থক্য হল যে পরেরটি দীর্ঘমেয়াদী। অধিকাংশ রোগীর ওজন ঠিক থাকে। কারও কারও জ্বর, শরীর ম্যাজ ম্যাজ করা ও পেটে অশ্বস্তি লাগার সমস্যা হতে পারে। ক্রনস ডিজিজের মূল সমস্যা হলো আমাশয়, পেটে ব্যথা এবং ওজন কমে যাওয়া। খাওয়ার সাথে ওজন কমে যাওয়ায় রোগী খেতে পারে না। ফলে ধীরে ধীরে ওজন কমে যেতে থাকে এবং ভিটামিনের অভাব থেকে রক্তশূন্যতা, রক্তে তারল্য বৃদ্ধি, স্নায়ুতে সমস্যা ইত্যাদি হতে পারে। কারও কারও পায়খানার সাথে বমি ও মুখে ঘা হতে পারে।

আলসারেটিভ কোলাইটিস ও ক্রনস ডিজিজ উভয় রোগেই অন্ত্রনালীর বাইরে বেশ কিছু সমস্যা দেখা দিতে পারে। যেমন: কনজাঙ্কটিভাইটিস, আইরাইটিস ইত্যাদি চোখের সমস্যা, ফ্যাটিলিভার, পিত্তথলীর পাথর ও প্রদাহ,  গিড়ায় ব্যথা, চর্মরোগ ইত্যাদি। সুতরাং দীর্ঘমেয়াদী আমাশয়ের, পাশাপাশি এ জাতীয় সমস্যাগুলো থাকলে চিকিৎসকরা আইবিডির ব্যাপারে সন্দেহ করেন।

আইবিডি রোগ নির্ণয় করার জন্য বিভিন্ন ধরনের পরীক্ষা নিরীক্ষার প্রয়োজন পড়ে। এর মধ্যে আছে: অণুবীক্ষণ যন্ত্র দিয়ে পায়খানার পরীক্ষা ও কালচার স্টাডি, এন্ডোস্কপি, কলোনস্কপি, ব্যারিয়াম এনেমা। আইবিডি রোগটি যেমন দীর্ঘমেয়াদী এর চিকিৎসাও দীর্ঘমেয়াদী। আইবিডির চিকিৎসায় দীর্ঘদিন স্টেরওয়েড, স্যালাজিন, মিথোট্রিক্সেট, সাইক্লোস্পরিন, এন্টাই টিএনএফ ইত্যাদি শক্তিশালী ঔষধ ব্যবহার করতে হয়। এ জন্য এ রোগের চিকিৎসা নিয়মিত চিকিৎসকের সান্নিধ্যে থেকে করতে হয়। তদুপরী যাদের ৮ বছরের বেশী সময় ধরে আইবিডি রোগ থাকে তাদের অন্ত্রে ক্যান্সার হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। এ কারণে এ রোগের ব্যাপারে অবহেলা করার ন্যূনতম সুযোগ নেই।

পরিশেষে
আমরা এই প্রবন্ধটির মধ্য দিয়ে মানবদেহের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও কমন একটি সমস্যা সম্পর্কে জানতে পারলাম। যেহেতু আমাশয় স্বল্পমেয়াদী থেকে দীর্ঘমেয়াদী যে কোন রকম হতে পারে এবং এদের চিকিৎসার ধরনও ভিন্ন, সেহেতু আমাদের উচিৎ এ রোগগুলোর ব্যাপারে নিজেরা সচেতন থাকা এবং আমাদের আত্মীয়-স্বজন, বন্ধুবান্ধব, পরিচিতজনদের সচেতন করে চিকিৎসা গ্রহণে উৎসাহিত করা। পাশাপাশি, যাদের দীর্ঘদিন অথবা ঘন ঘন পেটের অসুখের সমস্যা হয় তাদের লিভারের কোন সমস্যা আছে কিনা তা নির্ণয় করে নেয়া দরকার। কেননা, যদি লিভারে প্রদাহ থাকে এবং তা প্রাথমিক পর্যায়েই নির্ণয় করা যায় তাহলে নিয়মিত চিকিৎসা গ্রহণ করে লিভার সিরোসিস নামক জটিল সমস্যাও প্রতিরোধ করা যেতে পারে।