লিভারের আত্মকথা

অধ্যাপক মবিন খান
লিভার বিভাগ
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়
শাহবাগ, ঢাকা, বাংলাদেশ।

আপনার জীবনের নিরাপত্তা, সুস্থতা এবং শান্তির জন্য আমি সবসময় কর্ম তৎপর থাকি। আপনি কি আমাকে চিনেন। আমি আপনার দেহেরই একটি অঙ্গ। আমার নাম লিভার। আমি আপনার দেহে সব চেয়ে বড় সলিড অঙ্গ। আমি আপনার পেটের ডান দিকে উপরিভাগে বসবাস করি। আপনার শ্বাস নিঃশ্বাসে উঠানামা করি। পেট থেকে ফুসফুসকে আলাদা করতে যে পর্দা রয়েছে তার নাম ডায়াফ্রাম। ডায়াফ্রামের নিচেই আমার অবস্থান। আমার  অঙ্গের খানিকটা অংশ বুকের পাজরের নীচে আবৃত থাকে। প্রাপ্ত বয়স্ক হলে আমার ওজন হয় ১.২ / ১.৫ কেজি।

আপনি যখন মাতৃগর্ভে ভ্রুন হিসাবে আপনার আকৃতিতে ক্রমবর্ধমান থাকেন তখনই আমি তিন সপ্তাহের সময় জন্ম লাভ করতে থাকি। আমার জন্মের উৎপত্তির স্থল আপনার দেহের পেটের মধ্যে ক্ষ্রদ্রান্তের একটি অংশ যার নাম ডিওডেনাম। তার থেকে উঁকিমারা এন্ডোডার্মের বিস্তার লাভের মাধ্যমে (এন্ডোডার্মাল বাড) যা পরবর্তিতে উকি মারা অংশ হেপাটিক ও বিলিয়ারী বাড দুই নামে বিভক্ত হয়। পর্য্যায়ক্রমে মহান আল্লাহর কুদরতে আমি লিভার কোষ এবং ডাকটাল কোষে বিভক্ত হয়ে পূর্নাঙ্গরূপ লাভ করতে থাকি। এটা ঘটে সেপটাম ট্রান্সভারসাম নামক পর্দায়। সাথে সাথে আমার দেহকে পরিপুর্নভাবে স্বয়ংসম্পুর্ন করার জন্য রক্তনালী এবং ধমনী বিস্তারিত হয়। আমার দেহ হতে রস নিঃস্বরণ শুরু হয় মাতৃগর্ভে বার সপ্তাহের মধ্যে থেকে। আমার শিশু অবস্থায় আপনি যখন মায়ের গর্ভে তখন আপনার জন্য রক্ত কনিকা তৈরীর দায়িত্ব আমার উপরে ন্যাস্ত থাকে। আপনি ভূমিষ্ট হওয়ার দুইমাস পর্যন্ত আমি এই দায়িত্বে ন্যাস্ত থাকি।

আমার শরীরটা গঠিত হয় ইটের মত সারিবদ্ধ ভাবে বিন্যস্ত লিভার কোষ দ্বারা। এই কোষগুলি এতই সুক্ষ যে প্রতিটি স্তরে একটি মাত্র কোষ দ্বারা পরস্পর জোড়া লাগা থাকে। এই অবস্থায় ছয় কোন বিশিষ্ট আমার প্রতিটি কোষ (হেপাটোসাইট) দুই পিটের দুই দিকে পোর্টাল সাইনো সোয়েড, অপর দুই দিকে থাকে পিত্তনালীর ট্রাইবোটারিজ এর ক্ষুদ্র অংশ।  আর দুই দিকের পরস্পর কোষের সারিবন্ধভাবে অবস্থিত ইন্টার সেলুলার জাংশন। আমার শরীরের দুই দিক থেকে রক্ত সঞ্চালিত হয় একটি হল হেপাটিক আর্টারি (৩৫%) আরেকটি হল পোর্টাল সিসটেম (৬৫%)।

আপনি সারা জীবন যত মধুর খাবারই খান না কেন সব খাবারই পরিপাকতন্ত্রের বিপাকের পর পোর্টাল ভেনের মাধ্যমে আমার দেহে আনিত হয়। আমাকে এতই কর্মব্যস্ত থাকতে হয় যে আমার প্রতি গ্রাম টিসু প্রতি মিনিটে ১ সিসি রক্তের দ্বারা প্লাবিত হয়। এ কাজটি আমি অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে করে থাকি। এখানে আমার কেমিক্যাল ফ্যাক্টিটিতে ক্রিয়া বিক্রিয়ার পর সব রকম খাবার দ্রব্য, ঔষধ-পথ্য, টকসিন আপনার দেহ হতে নির্গত হরমোন এবং রাসায়নিক পদার্থ প্রক্রিয়াজাত করা হয়। আল্লাহর অসিম কুদ্রতে ও নির্দেশে প্রতিনিয়ত নিয়মিত ভাবে এবং পরিমিত ভাবে এসসমস্ত রাসায়নিক দ্রব্য প্রক্রিয়াজাত করনের পর আমি শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রতঙ্গে সরবরাহ করে থাকি। আপনার জীবনের জন্য আমার সুস্থতা একান্ত অপরিহার্য। আমার দেহ ৬০ ভাগ লিভার কোষ আর বাকি ৪০ ভাগ বাইল কোষ ও অন্যান্য সাপোর্টিং স্ট্রাকচার দ্বারা গঠিত।

আমার দেহের কার্যক্রম সুশৃংখল ভাবে সুসম্পন্ন করার জন্য আমার দেহের ক্ষদ্রতম ফাংশনাল ইউনিটকে  এসিনাস বলা হয়। সারিবদ্ধভাবে অবস্থিত লিভার কোষের দুই পাশে অবস্থিত হেপাটিক সাইনোসোয়েড এ সবরকম খাবার এসে জমা হয় অতঃপর বৈজ্ঞানিক প্রক্রিযায় সবরকম খাবার লিভার কোষে প্রবেশ করে। ফ্যাকটরির কার্যক্রম তখন থেকেই যাত্রা শুরু। শরীরের যত সব খাবার আমরা গ্রহন করি না কেন পরক্ষনেই সব খাবারই পোর্টাল  সাইনোসোয়েড এ এসে লিভার কোষে প্রবেশের জন্য সারিবদ্ধ ভাবে নিয়ম তান্ত্রিক পদ্ধতিতে প্রবেশ করে, শুধুমাত্র রক্তের সাথে প্রবাহিত ফরম এলিম্যান্ট ছাড়া।

এ বিশাল এবং অনেক অজানা রাসায়নিক ক্রিয়া প্রক্রিয়া এতই সূক্ষভাবে পরিচালিত হয় তার কিছুই আমরা জানি না। সামান্য যতটুকু জানি তা চিন্তা করলে মহান আল্লাহ তায়ালার অনাবিস্কৃত সৃষ্টি রহস্য মনে পড়ে যায়। আমরা জ্ঞান বিজ্ঞানের উন্নতির শিখরে আছি বলে অনেক বৈজ্ঞানিক দাবি করেন কিন্তু সঠিক তথ্য হল জীবনের ক্ষুদ্রতম জীবকোষটুকু কি ভাবে নিয়ন্ত্রিত হয় এবং কাজ করে তা আমরা এখনও সম্পুর্ন ভাবে জানি না। এতদ সত্বেও প্রতিয়মান হয় যে সব খাবারই প্রক্রিয়াজাত করার কিছু কিছু লিভার আপদ কালিন সময়ের জন্য জমা রাখে যেমন গ্লাইকোজেন, এমাইনো এসিড, ফ্যাট সলিউবল ভিটামিন (এ, ডি, ই, কে) এবং খনিজ পদার্থ যেমন, আয়রন, কপার, মেঙ্গানিজ এবং আরও কতকি।

অসুখে বিসুখে আক্রান্ত হয়ে অনেক সময় লিভার কোষ সংখায় কমে যায়, যা অকার্যকর হয়ে যায়। সে সময় আসতে বেশ সময় লাগে। আমার শরীরের এতটুকু রিজার্ভ ক্ষমতা আল্লাহ দিয়েছেন যে, আমার দেহের ১/১১ অংশ কার্যকর থাকলেও আমি আপনার দেহের জন্য সবরকম রাসায়নিক পদার্থ সরবরাহ করতে সক্ষম। সে জন্য আপনি আমার দেহের কার্যক্ষমতা অনেক অংশেই বিঘিœত না হলে উপলব্ধি করতে পারেন না আমার বেদনা কতটুকু আছে। আরেকটি সুখবর হল আমার কোষের মৃত্যু হলেও সুযোগ পেলে আমি অতি তাড়াতাড়ি রিজেনারেট করে আপনার দেহকে সুস্থ্য রাখতে সচেষ্ট হই এবং সক্ষম।
আপনার অসাবধানতায় অনেক সময় আমি অস্স্থু হয়ে পড়ি। যেমন আপনার যেখানে সেখানে খাওয়ার অভ্যাস, রাস্তার ধারে ফল, পানি,  ফলের রস, কিংবা খোলা খাবার খাওয়ার স্বভাবে আমি অসুস্থ হয়ে যাই। তখন আমার দেহে হেপাটাইটিস এ ও ই ঢুকে প্রদাহের সৃষ্টি করে। আমার অনেক জীবকোষ মরে যায়। এ তুফানে আপনিও জন্ডিসে আক্রান্ত হন।

অনেক সময় আপনি নিজে অসুস্থ হলে হাসপাতালে ভর্তি হন। তখন ইনজেকশন, ব্লাড ট্রান্সফিউশন, দূষিত সুই, সিরিজ, যন্ত্রপাতি ব্যবহারের মাধ্যমে আমার দেহে হেপাটাইটিস বি ও সি ঢুকে যায়, তখন আমি গুরুতর ভাবে আক্রান্ত হই এবং আপনি শিশু অবস্থায় থাকলে শতকরা ৯৫ ভাগ আমার দেহে দীর্ঘ মিয়াদি লিভার প্রদাহ হয়ে যায়। সি ভাইরাস তুষের আগুন, দেখা যায় না, আঙ্গুল দিলে পুড়ে যায়। তেমনি করে আমার দেহতে সি ভাইরাস ঢুকলে শতকরা ৭৫-৮৫ ভাগ কোষে অনির্দিষ্টকালের জন্য দীর্ঘ মিয়াদী প্রদাহের সৃষ্টি করে। আপনি হয়ত জানতেও পারেন না, বুঝতেও পারেন না এ অবস্থায় অনেক বছর চলে যায় অথচ আমি দীর্ঘ দিন এ প্রদাহে ভূগে জীর্ন শির্ন  হয়ে যাই। আমার কর্মক্ষমতা লোপ পেতে থাকে। এক সময় আমার দেহে সিরোসিস কিংবা ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়। তা ছাড়া অনেক সময় আপনি ব্যক্তিগত অনৈতিক কাজে লিপ্ত হলে কিংবা সুই বা সিরিজ দিয়ে ড্রাগ এ্যাডিকশনে অভ্যস্থ হয়ে পড়লে আমি অসুস্থ হয়ে পড়ি। আপনি যখন নেশাগ্রস্ত  হয়ে এ্যালকোহলে আসক্ত থাকেন, তখন আমার উপায় থাকে না। আমি সর্বহারা হয়ে গৃহিত এ্যালকোহল খেয়ে প্রকিয়াজাত করতে নিঃশেসিত হয়ে যাই। তখন আমার শরীর জীর্ন শির্ন হয়ে সিরোসিসে আক্রান্ত হয়।

কতআর বলবো আমার দুঃখের কথা, আরো কত রোগে শোকে আমি যে আক্রান্ত হই কে রাখে আমার খোজ। যেমন খোলা খাবার খেলে যে জন্ডিস হয় শুধু তাই নয় অনেক সময় আমার দেহে বিরাট ফোঁড়া দেখা দেয়। আপনি জ্বরে আক্রান্ত হন, খাবারের রুচি নষ্ট হয়ে যায়, পেটের ডান পাশে ব্যাথা হয়, আপনি জীর্ন শীর্ন হয়ে পড়েন।

মা যখন গর্ভবতী থাকে তখন আমার প্রতি যন্ত্রবান হওয়া উচিত। কারণ গর্ভবতি অবস্থায় মা জন্ডিসে আক্রান্ত হলে মার এবং গর্ভস্থ্য সন্তান উভয়ের জীবন হানি হতে পারে। সেজন্য আমি অসুস্থ হলে গর্ভবতী মার জন্য বিপদ ঘটতে পারে। শুধু কি তাই বেচে গেলেও রক্ষা অনেক সময় হয় না। বিশেষ করে হেপাটাইটিস বি রোগে আক্রান্ত হলে গর্ভজাত সন্তানের ও আমার জীবনহানি ঘটতে পারে।

বাংলাদেশে আমি যখন বসবাস করি তখন আপনি দয়া করে সাবধানতা অবলম্বন করে চললে অনেক রোগ থেকে আমি রক্ষা পাই। আপনিও বাচতে পারেন, আমিও সুস্থ থাকি। যেমন আপনার সুশৃংখল জীবন, খাওয়া দাওয়ার অভ্যাসের সাবধানতা, সুষম খাবার গ্রহন, প্রয়োজনীয় ইনজেকশন ব্যবহারের সময় ডিসপোজেবল সিরিজ্ঞ ব্যবহার, রক্ত দিতে হলে রক্ত টেষ্ট করতে হবে, তা হেপাটাইটিস বি ও সি মুক্ত কিনা। হাসপাতালে ভর্তি হলে খেয়াল রাখতে হবে যন্ত্রপাতি প্রর্পালি স্টেরিলাইজ করানো কিনা। আর আমাদের দেশে দাঁতের চিকিৎসা এবং সেলুনে চুলকাটা ও দাড়ি সেভ করার সময় ডিসপোজেবল ব্লেড ব্যবহার করা হয় কিনা সেদিকে দৃষ্টি রাখতে হবে। জীবনে আল্লাহর বিধান অনুযায়ী চললে অনেক বিপদ আপদ, রোগ শোক থেকে মুক্তি পাওয়া যায় এবং জীবন হয় সাবলীন, সুস্থ ও নির্বিগ্ন। আপনি ভাল থাকুন এবং আমাকে সুস্থ ভাবে বেঁচে থাকার সুযোগ দিন। আমি লিভার আপনার সুস্থতার জন্য সব সময় কর্মক্ষম ও তৎপর থাকবো।